তীব্র তারল্য সংকটে বেসরকারি খাত

উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসার প্রবৃদ্ধি শ্লথ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহারের ভারিত গড় ছিল ১১ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসার প্রবৃদ্ধি শ্লথ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহারের ভারিত গড় ছিল ১১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদহার এখন ১৪-১৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে। আবার সংকটে থাকায় গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না কয়েকটি ব্যাংক। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কর্মীদের বেতনও দিতে পারছে না। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে প্রকট হয়ে উঠেছে তারল্য সংকট।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ ছিল ১৬ লাখ ৪১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। আগস্ট শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪২ হাজার ৭০২ কোটি টাকায়। এ হিসাবে এক মাসে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি খাতের উৎপাদনকে চাপে রেখেছে জ্বালানি সংকট। এ চাপকে আরো বাড়িয়ে তোলে সাম্প্রতিক শ্রম অসন্তোষ। আবার ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক অস্থিরতারও ভুক্তভোগী বেসরকারি খাত। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোই ভুগছে সবচেয়ে বেশি। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট মোকাবেলার বড় একটি উপায় হলো ব্যাংক ঋণ। কিন্তু ব্যাংকে উচ্চ সুদহার ও তারল্য সংকটের কারণে সেটি পাওয়াও মুশকিল হয়ে পড়েছে।

ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ জব্বার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেকগুলো ব্যাংকের এডি রেশিও যেটা আছে সেটা ক্রস করে ফেলেছে। আগেই তারা বেশি ডিসবার্স করেছে। ব্যাংক থেকে অনেক টাকাও উঠিয়ে নিয়েছে অনেকে। যদিও ব্যাংকগুলো কেস টু কেসভিত্তিক ক্লায়েন্ট হিসেবে ঋণ সুবিধা দিচ্ছে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ভুগছে। তারল্য সংকটের সময় দেখা যায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেতন নিয়ে সংকটের মধ্যে পড়ে যায়। তারল্য সংকটের কারণেই ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যাংকও সাপোর্ট দেয়। কিন্তু ব্যাংকগুলো এখন সেটা পারছে না। এজন্যই সংকট এখন দৃশ্যমান। তারল্য সংকট তীব্র। শুনছি সুদহার আরো বাড়তে পারে। সবকিছু মিলিয়ে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এ মুহূর্তে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যবেক্ষণ করছে কীভাবে সরকার জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। বিদ্যমান জ্বালানি সরবরাহের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল রাখা নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এক্ষেত্রেও ক্ষুদ্র ও মাঝারিরাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে।’

অনেকটা একই বক্তব্য এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেনের। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গ্যাস ও অন্যান্য অসুবিধা নিয়ে আগে থেকেই ভোগান্তিতে ছিল বেসরকারি খাত। এরপর শিল্প ভাংচুরের মতো অস্থিরতাও মোকাবেলা করতে হয়েছে। এসব কারণে উৎপাদন যতটুকু দরকার তা করা সম্ভব হয়নি। অনেকেরই উৎপাদন ৩০-৪০ শতাংশ কমে গেছে। এ পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠানের তারল্য প্রবাহে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু অন্য খরচগুলো কমছে না। চাপ কম থাকায় গ্যাস বিল বেশি দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে, বেতন দিতে হচ্ছে। আবার ব্যাংকের ঋণ ও সুদ পরিশোধ করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সুদহার এখন ১৪ শতাংশ হয়েছে। চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়লে ১৬-১৭ শতাংশ হয়ে যায়। মার্চের পর একটা কিস্তি বাদ পড়লে তা মন্দ ঋণ হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে তারল্য সমস্যায় অনেকেরই ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাংক নতুন কোনো এক্সপোজার নিচ্ছে না। তাদের চেষ্টা সংগ্রহ কতটা বাড়ানো যায়। সামগ্রিকভাবেই তারল্য প্রবাহের ওপর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেতিবাচক হতো যদি সুদহার ৯ শতাংশ হতো, এখন ১৪ শতাংশ বলেই মাসভিত্তিক প্রবাহ প্রায় সমান দেখা যাচ্ছে।’

ব্যাংক খাতের বর্তমান অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে পুঁজির প্রবাহে। পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকট। উদ্যোক্তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা অবলম্বন করছেন বিনিয়োগকারীরা। এ বিষয়টিও বেসরকারি খাতে তারল্যের সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেসরকারি খাত থেকে বিনিয়োগ হচ্ছে না। সবাই ‘‍ওয়েট অ্যান্ড সি’ মনোভাব নিয়ে আছে। আগ্রাসীভাবে বিনিয়োগে কেউ নেই। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে আমরা গিয়েছি। এছাড়া রিজার্ভ সংকটের বিষয় আছে, ঋণপত্র খোলা নিয়ে সংকট আছে। অর্থনীতি সাংঘাতিক একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক ব্যাংকের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের তারল্য সংকট আছে। ঋণ প্রবৃদ্ধি খারাপ হওয়ারই কথা। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে যারা বেতন দিতে না পারার মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি না থাকাটা স্বাভাবিক।’

ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, জুলাই-আগস্টে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও স্বাভাবিক ছিল না। এ কারণে বেসরকারি খাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। উদ্যোক্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণের নামে অর্থ বের করে নেয়ার প্রবণতাও কমেছে।

জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার ও লেখক ফারুক মঈনউদ্দীনের ভাষ্যমতে, দেশের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ পুরোপুরি থমকে আছে। নতুন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার তেমন কোনো উদ্যোগও নেই। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে।

ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সেবা ও শিল্প উৎপাদন মোটামুটি বেসরকারি খাতনির্ভর। এ খাতে বড় ব্যবসায়ী ও অলিগার্করা গত ১৫ বছর ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে বড় হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অলিগার্করা আগের মতো ঋণ কিংবা সুযোগ-সুবিধা পাবেন না।৷ তাদের কেউ কেউ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন। আবার ব্যাংকগুলোও তারল্য সংকটে ভুগছে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাত চাঙ্গা করা না গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা কর্মসংস্থান কিছুই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না।’

আরও